প্রায় সকলেরই ইহা ঘটে যে, অধিক মানসিক যন্ত্রণার সময়, অধিক ক্ষণ ধরিয়া একা, মর্‍মভেদী চিন্তায় নিমগ্ন হইলে মনের কোন কোন কথা মুখে ব্যক্ত হয়। জেব-উন্নিসার শেষ কথা কয়টি সেইরূপ ব্যক্ত হইল। তিনি সেই অন্ধকার নিশীথে, গাঢ়ান্ধকার কক্ষমধ্য হইতে সেই বায়ুর হুঙ্কার ভেদ করিয়া যেন কাহাকে ডাকিলেন, “হয় সাপ! নয় মবারক!” কেহ সেই অন্ধকারে উত্তর করিল, “মবারককে পাইলে তুমি কি মরিবে না?”

“এ কি এ!” বলিয়া জেব-উন্নিসা উপাধান ত্যাগ করিয়া উঠিয়া বসিল। যেমন গীতধ্বনি শুনিয়া হরিণী উন্নমিতাননে উঠিয়া বসে; তেমনই করিয়া জেব-উন্নিসা উঠিয়া বসিল। বলিল, “এ কি এ? এ কি শুনিলাম! কার এ আওয়াজ?”

উত্তর করিল, “কার?”

জেব-উন্নিসা বলিল, “কার! যে বেহেস্তে গিয়াছে, তারও কি কণ্ঠস্বর আছে! সে কি ছায়া মাত্র নহে? তুমি কি প্রকারে বেহেস্ত হইতে আসিতেছ, যাইতেছ, মবারক? তুমি কাল দেখা দিয়াছিলে, আজ তোমার কথা শুনিলাম–তুমি মৃত, না জীবিত? আসিরদ্দীন কি আমার কাছে মিছা কথা বলিয়াছিল? তুমি জীবিত হও, মৃত হও, তুমি আমার কাছে–আমার এই পালঙ্কে মুহূর্‍ত জন্য বসিতে পার না? তুমি যদি ছায়া মাত্রই হও, তবু আমার ভয় নাই। একবার বসো |”

উত্তর করিল, “কেন?”

জেব-উন্নিসা সকাতরে বলিল, “আমি কিছু বলিব। আমি যাহা কখন বলি নাই, তাহা বলিব |”

মবারক–(বলিতে হইবে না যে, মবারক সশরীর উপস্থিত) তখন অন্ধকারে জেব-উন্নিসার পার্শ্বে পালঙ্কের উপর বসিল। জেব-উন্নিসার বাহুতে তাহার বাহু স্পর্শ হইল,-জেব-উন্নিসার শরীর হর্ষকণ্টকিত, আহ্লাদে পরিপ্লুত হইল;-অন্ধকারে মুক্তার সারি গণ্ড দিয়া বহিল। জেব-উন্নিসা আদরে মবারকের হাত আপনার হাতের উপর তুলিয়া লইল। বলিল, “ছায়া নও প্রাণনাথ! আমায় তুমি যা বলিয়া ভুলাও, আমি ভুলিব না। আমি তোমার; আবার তোমায় ছাড়িব না |” তখন জেব-উন্নিসা সহসা পালঙ্ক হইতে নামিয়া, মবারকের পায়ের উপর পড়িল; বলিল, “আমায় ক্ষমা কর! আমি ঐশ্বর্‍যের গৌরবে পাগল হইয়াছিলাম। আমি আজ শপথ করিয়া ঐশ্বর্‍য ত্যাগ করিলাম–তুমি যদি আমায় ক্ষমা কর, আমি আর দিল্লী ফিরিয়া যাইব না। বল তুমি জীবিত?”

মবারক দীর্‍ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিল, “আমি জীবিত। একজন রাজপুত আমাকে কবর হইতে তুলিয়া চিকিৎসা করিয়া প্রাণদান দিয়াছিল, তাহারই সঙ্গে আমি এখানে আসিয়াছি |”

জেব-উন্নিসা পা ছাড়িল না। তাহার চক্ষুর জলে মবারকের পা ভিজিয়া গেল। মবারক তাহার হাত ধরিয়া উঠাইতে গেল। কিন্তু জেব-উন্নিসা উঠিল না; বলিল, “আমায় দয়া কর, আমায় ক্ষমা কর |”

মবারক বলিল, “তোমায় ক্ষমা করিয়াছি। না করিলে, তোমার কাছে আসিতাম না |”

জেব-উন্নিসা বলিল, “যদি আসিয়াছ, যদি ক্ষমা করিয়াছ, তবে আমায় গ্রহণ কর। গ্রহণ করিয়া, ইচ্ছা হয় আমাকে সাপের মুখে সমর্পণ কর, না ইচ্ছা হয়, যাহা বল, তাহাই করিব। আমায় আর ত্যাগ করিও না। আমি তোমার নিকট শপথ করিতেছি যে, আর দিল্লী যাইতে চাহিব না; আলম‍গীর বাদশাহের রঙ‍মহালে আর প্রবেশ করিব না। আমি শাহজাদা বিবাহ করিতে চাহি না। তোমার সঙ্গে যাইব |”

মবারক সব ভুলিয়া গেল–সর্পদংশন জ্বালা ভুলিয়া গেল–আপনার মরিবার ইচ্ছা ভুলিয়া গেল–দরিয়াকে ভুলিয়া গেল। জেব-উন্নিসার প্রীতিশূন্য অসহ্য বাক্য ভুলিয়া গেল। কেবল জেব-উন্নিসার অতুল রূপরাশি তাহার নয়নে লাগিয়া রহিল; জেব-উন্নিসার প্রেমপরিপূর্ণ কাতরোক্তি তাহার কর্‍ণমধ্যে ভ্রমিতে লাগিল; শাহজাদীর দর্প চূর্ণিত দেখিয়া মন গলিয়া গেল। তখন মবারক জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কি এখন এই গরিবকে স্বামী বলিয়া গ্রহণ করিতে সম্মত?”