মা। একজন মোগল সওয়ার।

বাস্তবিক, মাণিকলাল মোগলদিগের মধ্যে একজনকেও চিনিত না। কাহারও নাম জানে না। সে মনে ভাবিল, দুই হাজার মোগলের মধ্যে অবশ্য একজন মহম্মদ আছেই আছে–আর সকল মোগলই “খা |”

পানওয়ালী বলিল, “এ ঘরে হইবে না। আর একটা ঘর ভাড়া লইতে হইবে |”

তখনই দুই জনে বাজারে গিয়া আর একটা ঘর লইল। পানওয়ালী মোগলের অভ্যর্থনা জন্য তাহা সজ্জিতকরণে প্রস্তুত হইল–মাণিকলাল পত্র লইয়া মুসলমান শিবিরে উপস্থিত হইল। শিবিরমধ্যে মহাগোলযোগ–কোন শৃঙ্খলা নাই–নিয়ম নাই। তাহার ভিতরে বাজার বসিয়া গিয়াছে। রঙ্গ তামাসা রোশনাইয়ের ধুম লাগিয়াছে। মাণিকলাল মোগল দেখিলেই জিজ্ঞাসা করে, “মহম্মদ খাঁ কে মহাশয়? তাঁহার নামে পত্র আছে |” কেহ উত্তর দেয় না–কেহ গালি দেয়;-কেহ বলে, চিনি না–কেহ বলে, “খুঁজিয়া লও |” শেষ একজন মোগল বলিল, “মহম্মদ খাঁকে চিনি না। কিন্তু আমার নাম নুর মহম্মদ খাঁ। পত্র দেখি, দেখিলে বুঝিতে পারিব, পত্র আমার কি না |”

মাণিকলাল সানন্দচিত্তে তাহার হস্তে পত্র দিল–মনে জানে, মোগল যাই হউক, ফাঁদে পড়িবে। মোগলও ভাবিল–পত্র যারই হউক, আমি কেন এই সুবিধাতে বিবিটাকে দেখিয়া আসি না। প্রকাশ্যে বলিল, “হাঁ, পত্র আমারই বটে। চল, আমি তোমার সঙ্গে যাইতেছি |” এই বলিয়া মোগল তাম্বুলমধ্যে প্রবেশ করিয়া চুল আঁচড়াইয়া গন্ধদ্রব্য মাখিয়া পোষাক পরিয়া বাহির হইল। বাহির হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “ওরে ভৃত্য, সে স্থান কত দূর?”

মাণিকলাল যোড়হাত করিয়া বলিল, “হুজুর, অনেক দূর! ঘোড়ায় গেলে ভাল হইত |”

“বহুত আচ্ছা” বলিয়া খাঁ সাহেব ঘোড়া বাহির করিয়া চড়িতে যান, এমন সময় মাণিকলাল আবার যোড়হাত করিয়া বলিল, “হুজুর! বড় ঘরের কথা–হাতিয়ারবন্দ হইয়া গেলেই ভাল হয় |”

নূতন নাগর ভাবিলেন, সে ভাল কথা–জঙ্গী জোয়ান আমি; হাতিয়ার ছাড়া কেন যাইব? তখন সঙ্গে হাতিয়ার বাঁধিয়া তিনি অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করিলেন।

নির্দিষ্ট স্থানে উপনীত হইয়া মাণিকলাল বলিল, “এই স্থানে উতারিতে হইবে। আমি আপনার ঘোড়া ধরিতেছি, আপনি গৃহমধ্যে প্রবেশ করুন |”

খাঁ সাহেব নামিলেন–মাণিকলাল ঘোড়া ধরিয়া রহিল। খাঁ বাহাদুর সশস্ত্রে গৃহমধ্যে প্রবেশ করিতেছিলেন, পরে মনে পড়িল যে, হাতিয়ারবন্দ হইয়া রমণীসম্ভাষণে যাওয়া বড় ভাল দেখায় না। ফিরিয়া আসিয়া মাণিকলালের কাছে অস্ত্রগুলিও রাখিয়া গেলেন। মাণিকলালের আরও সুবিধা হইল।

গৃহমধ্যে প্রবেশ করিয়া খাঁ সাহেব দেখিলেন যে তক্তাপোশের উপর উত্তম শয্যা; তাহার উপর সুন্দরী বসিয়া আছে–আতর-গোলাবের সৌগন্ধে তামাকু প্রস্তুত আছে। খাঁ সাহেব, জুতা খুলিয়া তক্তাপোষে বসিলেন, বিবিকে মিষ্টবচনে সম্ভাষণ করিলেন–পরে পোষাকটি খুলিয়া রাখিয়া, ফুলের পাখা হাতে লইয়া বাতাস খাইতে আরম্ভ করিলেন এবং আলবোলার নল মুখে পুরিয়া সুখের আবেশে টান দিতে লাগিলেন। বিবিও তাঁহাকে দুই চারিটা গাঢ় প্রণয়ের কথা বলিয়া একেবারে মোহিত করিল।

তামাকু ধরিতে না ধরিতে মাণিকলাল আসিয়া দ্বারে ঘা মারিল। বিবি বলিল, “কে ও?”

মাণিক বিকৃতস্বরে বলিল, “আমি |”

তখন চতুরা রমণী অতি ভীতকণ্ঠে খাঁ সাহেবকে বলিল, “সর্বলনাশ হইয়াছে–আমার স্বামী আসিয়াছেন–মনে করিয়াছিলাম, তিনি আজ আর আসিবেন না। তুমি এই তক্তাপোশের নীচে একবার লুকাও। আমি উঁহাকে বিদায় করিয়া দিতেছি |”