মুরলা আর আসে না, রমা আর ডাকে না, গঙ্গারাম অস্থির হইল। আহার নিদ্রা বন্ধ হইল। গঙ্গারাম মুরলার সন্ধানে ফিরিতে লাগিল। কিন্তু মুরলা রাজবাটীর পরিচারিকা—রাস্তাঘাটে সচরাচর বাহির হয় না, কেবল মহিষীর হুকুমে গঙ্গারামের সন্ধানে বাহির হইয়াছিল। গঙ্গারাম মুরলার কোন সন্ধান পাইলেন না। শেষ নিজে এক দূতী খাড়া করিয়া মুরলার কাছে পাঠাইলেন-তাকে ডাকিতে। রমার কাছে পাঠাইতে সাহস হয় না।

মুরলা আসিল-জিজ্ঞাসা করিল, “ডাকিয়াছ কেন?”

গঙ্গারাম। আর খবর নাও না কেন?

মু। জিজ্ঞাসা করিলে খবর দাও কই? আমাদের ত তোমার বিশ্বাস হয় না?

গ। তা ভাল, আমি গিয়াও না হয় বলিয়া আসিতে পারি।

মু। তাতে, যে ফল নৈবিদ্যিতে দেয় তার আটটি।

গ। সে আবার কি?

মু। ছোট রাণী আরাম হইয়াছেন।

গ। কি হইয়াছিল যে আরাম হইয়াছেন?

মু। তুমি আর জান না কি হইয়াছিল?

গ। না।

মু। দেখ নাই, বাতিকের ব্যামো?

গ। সে কি?

মু। নহিলে তুমি অন্দরমহলে ঢুকিতে পাও?

গ। কেন, আমি কি?

মু। তুমি কি সেখানকার যোগ্য?

গ। আমি তবে কোথাকার যোগ্য?

মু। এই ছেঁড়া আঁচলের। বাপের বাড়ী লইয়া যাইতে হয় ত আমাকে লইয়া চল। অনেক দিন বাপ-মা দেখি নাই।

এই বলিয়া মুরলা হাসিতে হাসিতে চলিয়া গেল। গঙ্গারাম বুঝিলেন, এ দিকে কোন ভরসা নাই। ভরসা নাই, এ কথা কি কখন মন বুঝে? যতক্ষণ পাপ করিবার শক্তি থাকে, ততক্ষণ যার মন পাপে রত হইয়াছে, তার ভরসা থাকে। “পৃথিবীতে যত পাপ থাকে, সব আমি করিব, তবু আমি রমাকে ছাড়িব না |” এই সঙ্কল্প করিয়া কৃতঘ্ন গঙ্গারাম, ভীষণমূর্তি হইয়া আপনার গৃহে প্রত্যাগমন করিল। সেই রাত্রিতে ভাবিয়া ভাবিয়া গঙ্গারাম রমা ও সীতারামের সর্বনাশের উপায় চিন্তা করিল।