রাজসিংহ
এদিকে মহারাণা চঞ্চলকুমারীর পত্রপাঠ সমাপ্ত ও মাণিকলালকে বিদায় করিয়া অনন্ত মিশ্রের তল্লাসে গেলেন। দেখিলেন, সেখানে ব্রাহ্মণ নাই–তৎপরিবর্তে তাঁহার ভৃত্যবর্গ এবং তাঁহার সমভিব্যাহারী অশ্বারোহীগণ আসিয়া অধিত্যকার তলদেশ ব্যাপ্ত করিয়াছে। রাণাকে দেখিতে পাইয়া সকলে জয়ধ্বনি করিয়া উঠিল। বিজয়, প্রভুকে দেখিতে পাইয়া, তিন লম্ফে অবতরণ করিয়া তাঁহার কাছে দাঁড়াইল। রাণা তাহার পৃষ্ঠে আরোহণ করিলেন। তাঁহার বস্ত্র রুধিরাক্ত দেখিয়া সকলেই বুঝিল যে, একটা কিছু ক্ষুদ্র ব্যাপার হইয়া গিয়াছে। কিন্তু রাজপুতগণের ইহা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার–কেহ কিছু জিজ্ঞাসা করিল না।
রাণা কহিলেন, “এইখানে এক ব্রাহ্মণ বসিয়াছিল; সে কোথায় গেল–কেহ দেখিয়াছিলে?”
যাহারা উহার পশ্চাদ্ধাবিত হইয়াছিল, তাহারা বলিল, “মহারাজ, সে ব্যক্তি পলাইয়াছে |”
রাণা। শীঘ্র তাহার সন্ধান করিয়া লইয়া আইস।
ভৃত্যগণ তখন সবিশেষ কথা বুঝিয়া নিবেদন করিল যে, “আমরা অনেক সন্ধান করিয়াছি, কিন্তু পাই নাই |”
অশ্বারোহিগণ মধ্যে রাণার পুত্রদ্বয়, তাঁহার জ্ঞাতি ও অমাত্যবর্গ প্রভৃতি ছিল। রাজা পুত্রদ্বয় ও অমাত্যবর্গকে নির্জণনে লইয়া গিয়া কথাবার্তাজ বলিলেন। পরে ফিরিয়া আসিয়া আর সকলকে বলিলেন, “প্রিয়জনবর্গ! আজি অধিক বেলা হইয়াছে; তোমাদিগের সকলের ক্ষুধাতৃষ্ণা পাইয়াছে সন্দেহ নাই। কিন্তু আজ উদয়পুরে গিয়া ক্ষুধাতৃষ্ণা নিবারণ করা আমাদিগের অদৃষ্টে নাই। এই পার্বহত্য পথে আবার আমাদিগকে ফিরিয়া যাইতে হইবে। একটি ক্ষুদ্র লড়াই জুটিয়াছে–লড়াইয়ে যাহার সাধ থাকে, আমার সঙ্গে আইস–আমি, এই পর্ব ত পুনরারোহণ করিব। যাহার সাধ না থাকে, উদয়পুরে ফিরিয়া যাও |”
এই বলিয়া রাণা পর্বাত আরোহণে প্রবৃত্ত হইলেন। অমনি “জয় মহারাণাকি জয়! জয় মাতাজীকি জয়!” বলিয়া সেই শত অশ্বারোহী তাঁহার পশ্চাতে পর্ব ত আরোহণে প্রবৃত্ত হইল। উপরে উঠিয়া “হর! হর!” শব্দে, রূপনগরের পথে ধাবিত হইল। অশ্বক্ষুরের আঘাতে অধিত্যকায় ঘোরতর প্রতিধ্বনি হইতে লাগিল।