রাজসিংহ
উদিপুরী পিয়ালা মুখে তুলিলেন, সেই অবসরে নির্মলকুমারী বহির্গত হইয়া যোধপুরী বেগমের কাছে উপস্থিত হইল। এবং যোধপুরীর জিজ্ঞাসামত যেমন যেমন ঘটিয়াছিল, তাহা বলিল। শুনিয়া যোধপুরী বেগম হাসিয়া বলিল, “কাল পত্রখানা ঠিক হইয়া পড়িবে। তুমি এই বেলা পলায়ন কর। নচেৎ কাল একটা গণ্ডগোল হইতে পারে। আমি তোমার সঙ্গে একজন বিশ্বাসী খোজা দিতেছি। সে তোমাকে মহালের বাহির করিয়া তোমার স্বামীর শিবিরে পৌঁছাইয়া দিবে। সেখানে যদি তোমার আত্মীয়-স্বজন কাহাকেও পাও, তার সঙ্গে আজই দিল্লীর বাহিরে চলিয়া যাইও। যদি শিবিরে কাহাকেও না পাও, তবে ইহার সঙ্গে দিল্লীর বাহিরে যাইও। তোমার স্বামী বোধ হয়, দিল্লী ছাড়াইয়া কোথাও তোমাদের জন্য অপেক্ষা করিতেছেন। পথে তাঁহার সঙ্গে যদি সাক্ষাৎ না হয়, তাহা হইলে এই খোজাই তোমাকে উদয়পুর পর্যন্ত রাখিয়া আসিবে। খরচ-পত্র তোমার কাছে না থাকে, তবে তাহাও আমি দিতেছি। কিন্তু সাবধান! আমি ধরা না পড়ি |”
নির্মল বলিল, “হজরৎ সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি রাজপুতের মেয়ে |”
তখন যোধপুরী বনাসী নামে তাঁহার বিশ্বাসী খোজাকে ডাকাইয়া যাহা করিতে হইবে, তাহা বুঝাইয়া বলিলেন। জিজ্ঞাসা করিলেন, “এখনই যাইতে পারিবে ত?”
বনাসী বলিল, “তা পারিব। কিন্তু বেগম সাহেবার দস্তখাতি একখানা পরওয়ানা না পাইলে এত করিতে সাহস হইতেছে না |”
যোধপুরী তখন বলিলেন, “যেরূপ পরওয়ানা চাহি, লিখাইয়া আন, আমি বেগম সাহেবার দস্তখত করাইতেছি |”
খোজা পরওয়ানা লিখাইয়া আনিল। তাহা সেই তাতারী প্রহরিণীর হাতে দিয়া রাজমহিষী বলিলেন, “ইহাতে বেগম সাহেবার দস্তখত করাইয়া আন |”
প্রহরিণী জিজ্ঞাসা করিল, “যদি জিজ্ঞাসা করে, কিসের পরওয়ানা?”
যোধপুরী বলিলেন, “বলিও, ‘আমার কোতলের পরওয়ানা |’ কিন্তু কালি কলম লইয়া যাইও। আর পাঞ্জা ছেপত করিতে ভুলিও না |”
প্রহরিণী কালি কলম সহিত পরওয়ানা লইয়া গিয়া জেব-উন্নিসার কাছে ধরিল। জেব-উন্নিসা পূর্বভাবাপন্ন জিজ্ঞাসা করিল, “কিসের পরওয়ানা?”
প্রহরিণী বলিল, “আবার কোতলের পরওয়ানা |”
জে। কি চুরি করেছিস্?
প্রহরিণী। হজরৎ উদিপুরী বেগমের পেশওয়াজ।
জে। আচ্ছা করেছিস–কোতলের পর পরিস।
এই বলিয়া বেগম সাহেবা পরওয়ানা দস্তখত করিয়া দিলেন। প্রহরিণী মোহর ছেপত করিয়া লইয়া যোধপুরী বেগমকে দিল। বনসী সেই পরওয়ানা এবং নির্মল কে লইয়া যোধপুরী মহাল হইতে যাত্রা করিল। নির্মল কুমারী অতি প্রফুল্লমনে খোজার সঙ্গে চলিলেন।
কিন্তু সহসা সে প্রফুল্লতা দূর হইল–রঙমহালের ফটকের নিকট আসিয়া খোজা ভীত, স্তম্ভিত হইয়া দাঁড়াইল। বলিল, “কি বিপদ্! পালাও! পালাও!” এই বলিয়া খোজা ঊর্ধ্বশ্বাসে পলাইল।