দেবী চৌধুরাণী
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
দুম্ করিয়া একটা বন্দুকের শব্দ হইল–ব্রজেশ্বরের মুখের কথা মুখে রহিল, দুই জনে চমকিয়া সম্মুখে চাহিয়া দেখিল–দেখিল, দূরে পাঁচখানা ছিপ আসিতেছে, বটিয়ার তাড়নে জল চাঁদের আলোয় জ্বলিতেছে। দেখিতে দেখিতে দেখা গেল, পাঁচখানা ছিপ সিপাহী-ভরা। ডাঙ্গা-পথের সিপাহীরা আসিয়া পৌঁছিয়াছে, তারই সঙ্কেত বন্দুকের শব্দ। শুনিয়াই পাঁচখানা ছিপ খুলিয়াছিল। দেখিয়া প্রফুল্ল বলিল, “আর তিলার্ধ বিলম্ব করিও না। শীঘ্র আপনার পান্সিতে উঠিয়া চলিয়া যাও।”
ব্র। কেন? এ ছিপগুলো কিসের? বন্দুক কিসের?
প্র। না শুনিলে যাইবে না?
ব্র। কোন মতেই না।
প্র। এ ছিপে কোম্পানির সিপাহী আছে। এ বন্দুক ডাঙ্গা হইতে কোম্পানির সিপাহী আওয়াজ করিল।
ব্র। কেন এত সিপাহী এদিকে আসিতেছে? তোমাকে ধরিবার জন্য?
প্রফুল্ল চুপ করিয়া রহিল। ব্রজেশ্বর জিজ্ঞাসা করিল, “তোমার কথায় বোধ হইতেছে, তুমি পূর্ব হইতে এই সংবাদ জানিতে।”
প্র। জানিতাম–আমার চর সর্বত্র আছে।
ব্র। এ ঘাটে আসিয়া জানিয়াছ, না আগে জানিয়াছ?
প্র। আগে জানিয়াছিলাম।
ব্র। তবে, জানিয়া শুনিয়া এখানে আসিলে কেন?
প্র। তোমাকে আর একবার দেখিব বলিয়া।
ব্র। তোমার লোকজন কোথায়?
প্র। বিদায় দিয়াছি। তারা কেন আমার জন্য মরিবে?
ব্র। নিশ্চিত ধরা দিবে, স্থির করিয়াছ?
প্র। আর বাঁচিয়া কি হইবে? তোমার দেখা পাইলাম, তোমাকে মনের কথা বলিলাম, তুমি আমায় ভালবাস, তাহা শুনিলাম। আমার যে কিছু ধন ছিল, তাহাও বিলাইয়া শেষ করিয়াছি। আর এখন বাঁচিয়া কোন্ কাজ করিব বা কোন্ সাধ মিটাইব? আর বাঁচিব কেন?
ব্র। বাঁচিয়া, আমার ঘরে গিয়া, আমার ঘর করিবে।
প্র। সত্য বলিতেছ?
ব্র। তুমি আমার কাছে শপথ করিয়াছ, আমিও তোমার কাছে শপথ করিতেছি। আজ যদি তুমি প্রাণ রাখ, আমি তোমাকে আমার ঘরণী গৃহিণী করিব।
প্র। আমার শ্বশুর কি বলিবেন?
ব্র। আমার বাপের সঙ্গে আমি বোঝাপড়া করিব।
প্র। হায়! এ কথা কাল শুনি নাই কেন?
ব্র। কাল শুনিলে কি হইত?
প্র। তাহা হইলে কার সাধ্য আজ আমায় ধরে?
ব্র। এখন?
প্র। এখন আর উপায় নাই। তোমার পান্সি ডাক–নিশি ও দিবাকে লইয়া শীঘ্র যাও।